ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নিজ দেশে পরবাসী -রাহাত মুস্তাফিজ

গত কয়েক বছর ধরে দেশে একটা ব্যাপার খুববেশি নিয়মিত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার আগে প্রতিমা ভাঙচুর করা। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত অপরাধীদের বিচারান্তে রায় দেওয়া শুরু হবার পর থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ যেন খুব সাধারণ ঘটনা।

এক সময় এ রকম ধারণা বেশ প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, সংখ্যালঘুদের জান, মালের ওপর আঘাত আওয়ামী লীগ ও অপরাপর প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ব্যতিত অন্য দলগুলোই কেবল করে। সে ধারণা এখন আর নেই।

মূল বিষয়টা যখন বৈষয়িক তখন ‘বিষয়’ হাতছাড়া করার আহামক্কি কে করতে চায়। তা সে যে দলের ডাই-হার্ট নেতা-কর্মী হোক না কেন। ওইসব ক্ষমতাবান, সম্পদলোভী, দখলদার, অসৎ, বর্বররা বিশ্বাস করে হিন্দুরা এ দেশে দূর্বল দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।

সংবিধানে এ দেশকে যতই ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বলা হোক, ওরা বাংলাদেশকে শতভাগ মুসলমানের দেশ হিসেবেই দেখতে আগ্রহী। সে কারণেই মুসলমান বাদে অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষকে তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটি ছাড়া করে পার্শবর্তী দেশে জোরপূর্বক চলে যেতে বাধ্য করে কিংবা বিতাড়নের অভিনব ফন্দিফিকির যোগাড় করে।

এই একটা কাজে দলমত নির্বিশেষে অদ্ভুত ঐক্য পরিলক্ষিত। এই ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপি , জামায়াত, জাতীয় পার্টি ‘ভাই ভাই(!)’। এ দেশে ধর্মীয় সংখালঘুরা তাদের ভগবান, ঈশ্বর ছাড়া কার কাছে বিচার চাইবে? কে তাদের দুর্ভাগ্যের কথা শুনবে? কে তাদের অভয় দেবে?

পশ্চিমববঙ্গের ধর্মীয় সংখ্যালঘুর সঙ্গে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুর হতাশাজনক পার্থক্য হলো ওখানকার মুসলমানদের হাতে ভোট দেওয়ার অনেকগুলো অপশন আছে। তৃণমূল, সিপিআইএম, সিপিআই, কংগ্রেস, বিজেপি ইত্যাদি। এরা প্রত্যেকেই মুসলিম ভোট নিজেদের বাক্সে আনার জন্য মরিয়া হয়ে থাকে।

আমাদের এখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা না পারে বিএনপিকে, না পারে জামায়াতকে ভোট দিতে। এই দলগুলোর চরম ডানপন্থী, সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সংখ্যালঘুরা আস্থাশীল হতে পারে না কিংবা নৈকট্য অনুভব করে না। বিএনপি-জামায়াতও বিশ্বাস করে না যে ওদের ভোট তারা পাবে।

আর অনেকগুলো টুকরো টুকরো বামেদের অনৈক্য, সাংগঠনিক ও নেতৃত্বের দূর্বলতা, কৌশলের প্রতি অবিচল থাকতে না পারা বা ভুল কৌশল গ্রহণ ইত্যাদি কারণে বামেদের প্রতিও সংখ্যালঘুরা ভরসা করতে পারে না।

আর এই মওকাটাই নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। দলের শরীরে তথাকথিত সেক্যুলারিজমের সুবাস লাগিয়ে নিশ্চিন্তে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারছে। তাছাড়া, এ ধারণা বিশ্বাস করানো গেছে যে, বিপদে-আপদে, জীবনে-মরণে আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগ তাদের একমাত্র রক্ষাকর্তা বন্ধু।

হিন্দু নারী ধর্ষণের শিকার হলে বা তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে দিলে কারও কিছু আসে যায় না। হিসাবটা একদম সরল মরো বাঁচো আওয়ামী লীগ ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু বিকল্প তো খুঁজতেই হবে। এভাবে তো চলতে পারে না।

একটা সম্প্রদায় একটা নির্দিষ্ট দল দ্বারা এভাবে জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না। একটা শক্তিশালী প্রকৃত বিকল্প অনিবার্য। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তরুণ ছেলেমেয়েরা বিষয়টি নিয়ে ভাববে এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি ।

রাহাত মুস্তাফিজ: কবি ও লেখক

আমাদের সময়.কম : ১০/১০/২০১৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *