সংখ্যালঘুর ভাষা রক্ষার দায়িত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠের

জোবাইদা নাসরীন: আমার একজন বন্ধু আছেন, যিনি কিনা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী মারমা সম্প্রদায়ের। একদিন কথা প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর বাবার নাম জীবন চৌধুরী। তত দিনে জেনে গেছি, এটি মারমা সম্প্রদায়ের নাম হতে পারে না। কীভাবে তাঁর বাবার নাম জীবন চৌধুরী হলো, তার ভেতরকার গল্প জানার আগ্রহ তৈরি হলো। তাঁকে জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল, তাঁর বাবা যখন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হতে গিয়েছিলেন, তখন স্কুলের শিক্ষক তাঁর নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি তাঁর মারমা ভাষায় রাখা নামটি বললেন। সেই স্কুলের বাঙালি শিক্ষক সাফ বলে দিয়েছিলেন, তিনি ওই সব নাম ধরে কাউকে ডাকতে পারবেন না। তখন সেই শিক্ষকই তাঁর বাবার নাম বদলে নতুন নাম রেখেছিলেন জীবন চৌধুরী। এর মাধ্যমেই নিজ ভাষায় নিজের নামের অধিকার হারিয়েছিলেন তাঁর বাবা। বাঙালি শিক্ষকের দেওয়া বাংলা নামের খোলসেই ছিলেন সারা জীবন। এখনো শুধু জীবন চৌধুরীই নন, অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী তাদের নিজস্ব ভাষার নামের সঙ্গে একটি করে বাংলা নাম নিজেরাই রেখে দেয়।

ভাষাগত সমস্যার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক স্কুল থেকে ঝরে পড়তে হয়েছিল আশির দশকে। বেশির ভাগ শিক্ষকই বাঙালি ছিলেন। সে ক্ষেত্রে পড়ার মাধ্যম বাংলা হওয়ায় তা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য সমস্যা তৈরি করত এবং সৃষ্টি হতো ভুল-বোঝাবুঝির। যেমন চাকমা ভাষায় ‘আপনি’ শব্দটি নেই। সেই ভাষায় সবাইকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করা হয়। নিজের মাতৃভাষায় কথা বলা বাচ্চারা স্কুলে শিক্ষককে ‘তুই’ করে সম্বোধন করত। সেখানেই ঘটত বিপত্তি। শিক্ষকেরা এটিকে ‘বেয়াদবি’ হিসেবে ধরে নিতেন এবং খেপে গিয়ে মারধর শুরু করতেন। সেই মারধরের ভয়ে ‘আদিবাসী’ শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করত।

আজ ৯ আগস্ট। বিশ্ব ‘আদিবাসী’ দিবস। ‘আদিবাসী ভাষা চর্চা এবং সংরক্ষণে এগিয়ে আসুন’ স্লোগান নিয়ে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিনটি। ১৯৪৮ সাল থেকে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ভাষা আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছিলেন এ দেশের সূর্যসন্তানেরা। সেই ভাষা আন্দোলনের বীজই মহিরুহ হয়ে নিয়ে গেছে এ দেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে। অথচ সেই স্বাধীন বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের ভাষা রক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের দ্বৈততা ও উদাসীনতা দৃশ্যমান। যদিও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর ২৩ নম্বর ধারাটিতে বলা আছে, ‘দেশের আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ ঘটানোর কথা’ এবং একই শিক্ষানীতির দ্বিতীয় অধ্যায়ে (প্রাক্‌-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা) ‘আদিবাসী শিশু’ শিরোনামের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আদিবাসী শিশুরা যাতে নিজেদের ভাষা শিখতে পারে, সেই লক্ষ্যে তাদের জন্য আদিবাসী শিক্ষক ও পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করা হবে।’ সেটিরই অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে পাঁচটি ভাষায় প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষার বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের কর্মসূচিও চলছে। তবে যেটি এখন পর্যন্ত চালু হয়নি, তা হলো ওই সম্প্রদায় থেকে শিক্ষক নিয়োগ, যাঁরা মাতৃভাষায় শিক্ষাদান করতে পারবেন।

একদিকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, অন্যদিকে ক্রমাগত প্রতিদিনকার জীবনযাপনে চাপের মুখে পড়ছে তাদের মাতৃভাষাও। এমনকি পরিবর্তিত হচ্ছে এলাকার নামও। যেমন ইতিমধ্যেই খাগড়াছড়ি সদরে ত্রিপুরা অধ্যুষিত এলাকা খাগড়াপুরের নাম হয়ে গেছে ইসলামপুর, বেবোন ছড়া হয়ে গেছে ভাইবোন ছড়া, উত্তোদাছড়ি হয়েছে রসুলপুর, পা-অং কার্বারী পাড়া হয়েছে ফাতেমা নগর। কী প্রক্রিয়ায় এই পরিবর্তনগুলো হচ্ছে, সে বিষয়ে রাষ্ট্র নীরব।

ভাষাবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী ওয়েবসাইট এথনোলগের মতে, বর্তমান পৃথিবীতে আনুমানিক ৭ হাজার ৯৭টি ভাষা বেঁচে আছে। এর মধ্যে ২ হাজার ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা ১ হাজারের কম। এ ছাড়া মোট ভাষার মাত্র অর্ধেকের আছে লিখিত রূপ। এসব ভাষায় ব্যবহার করা হয় ৪৬ ধরনের বর্ণমালা। বাকিগুলো শুধু মৌখিকভাবেই চর্চিত আছে।

ভাষা হারিয়ে যেতে পারে নানা কারণে। যুদ্ধবিগ্রহ বা আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্ঘটনায় কোনো নির্দিষ্ট ভাষাভাষী জনসংখ্যার অস্তিত্ব বিপন্ন হলে ভাষা হারিয়ে যায়। আবার কোনো জাতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক নিপীড়ন ও আগ্রাসনের কারণেও ভাষার ক্রমবিলুপ্তি ঘটতে পারে। বৃহত্তর সংস্কৃতির আগ্রাসন ও বিশ্বায়নের প্রবল দাপটে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। ইউনেসকোর মতে, এ শতাব্দীতে পৃথিবীতে অর্ধেকের বেশি ভাষা বেঁচে থাকবে না। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাকেন্দ্রিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী আগামী ২১১৫ সালে পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে মাত্র ৬০০টি ভাষা। আর কঠিন বাস্তবতা হলো, প্রতি ১৪ দিনে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একটি করে ভাষা।

তবে নিজেদের ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা। নিজেরাই নিজ ভাষায় প্রকাশ করছেন সাহিত্য পত্রিকা, লিটলম্যাগসহ অন্যান্য গল্প ও কবিতার বই। চাকমা ভাষায় বের হয় আলাম, হুচসহ আরও কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা; মণিপুরি ভাষায় পৌরী এবং গারো ভাষায় বের হয় থকবিরিম নামের সাহিত্য পত্রিকা। বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি থেকে বের হয় জানিরা।

বেশ কিছুদিন আগে একটি মুঠোফোন কোম্পানির ভাষার মাসের বিজ্ঞাপনে বাংলা ভাষার চর্চা এবং সেটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা কবি ও একজন কথাসাহিত্যিক বলেছেন, ‘মানুষ বেঁচে থাকে ভাষায়, আর ভাষা বেঁচে থাকে সাহিত্যে।’ তাই বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাগুলো বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাষার মানুষের। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর ব্যাপ্তি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারলে তাদের ভাষার চর্চা ও রক্ষায় বড় রকমের ভূমিকা থাকবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত
করার কথা বাংলাদেশে প্রচলিত আইন ও নীতিমালায় আছে। শুধু জাতীয় শিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করলেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি রক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। আমরা বিশ্বাস করি, সংখ্যালঘুর ভাষা রক্ষায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাষাভাষীর দায়িত্ব অনেক বেশি।

জোবাইদা নাসরীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক
Email: zobaidanasreen@gmail.com

সৌজন্যে: প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *