সুবর্ণজয়ন্তীতে আদিবাসীদের অর্জন ও অপ্রাপ্তি

সুবর্ণজয়ন্তীতে আদিবাসীদের অর্জন ও অপ্রাপ্তি

সঞ্জীব দ্রং

১. একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে, ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেই আমরা অঙ্গীকার করেছিলাম, বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করব। বাঙালি জাতির পাশাপাশি আদিবাসীরাও মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ও কষ্ট সইতে হয়েছে আদিবাসীদের। আমি একাত্তরে পরিবারের সঙ্গে শরণার্থী হয়েছিলাম ভারতের মেঘালয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে এসে গ্রামে ধ্বংসস্তূপ দেখেছিলাম। সম্পূর্ণ নতুন করে সব শুরু করতে হয়েছিল। এখন ভাবতে ভালো লাগছে যে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে আমরা দেখছি প্রিয় স্বদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে চলেছে। অন্যদিকে দৃশ্যমান হচ্ছে নাগরিকদের একটি অংশ, ৪০ লক্ষাধিক আদিবাসী মানুষ সবার সঙ্গে সমানতালে এগুতে পারছে না। একদিকে বিশাল বাজেটের মেগা সব প্রকল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অন্যদিকে সমাজের কিছু মানুষের জীবনে বৈষম্য ও হাহাকারের চিত্র প্রকট হচ্ছে। আদিবাসী জনগণ, চা শ্রমিক, দলিত, দূর পাহাড়, চর ও হাওর অঞ্চলের মানুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের দুয়ারে এই উন্নয়নের সমান সুফল পৌঁছাতে পারছে না।

ইতিবাচক যা কিছু অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতার ৫০ বছরে, তা হলো আদিবাসী ইস্যু নিয়ে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। দেশে নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি পর্যায়ে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হয়েছে, সংবাদমাধ্যম আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চকণ্ঠ আদিবাসী বিষয়ে। জাতীয় শিক্ষানীতিতে আদিবাসী ভাষায় পড়াশোনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ৫টি আদিবাসী ভাষায় বই রচিত হয়েছে। নারী উন্নয়ন নীতি, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় আদিবাসী ইস্যু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০১০ সালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন হয়েছে যেখানে নৃগোষ্ঠী বলতে আদিবাসীদের উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে ৫০টি আদিবাসী জাতির নাম সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় গেজেটভুক্ত করেছে। সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত না হলেও বাজেট বরাদ্দসহ কিছু পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। গবাদি পশু বিতরণ, কৃষি উপকরণ সরবরাহ, গৃহহীনদের জন্য ঘর, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সহায়তা, চাকরিতে সীমিত সুযোগ ইত্যাদি আদিবাসী জনগণ পাচ্ছে। সীমান্তবর্তী আদিবাসী গ্রামগুলোতেও বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর জাতীয় উৎসবে আদিবাসী শিল্পীরাও অংশগ্রহণ করছে। কঠিন করোনাকালে অপ্রতুল হলেও আদিবাসীরাও কিছু সহায়তা পেয়েছে। বলা যায়, এ ধরনের অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। দেশের সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।” দেশে আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস গঠিত হয়েছে এবং এই ককাস আদিবাসী অধিকার আইনের খসড়া তৈরি করে সংসদে জমা দিয়েছে। তবে এখনো তা আলোচনার জন্য আলোর মুখ দেখেনি। অন্যদিকে এখানে জাতিসংঘসহ অনেকে কাজ করছে। আদিবাসী সংগঠনগুলোর মধ্যেও ঐক্য ও সংহতি জোরদার হচ্ছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আদিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করছেন এবং এই বিষয়ে থিমেটিক গ্রুপ রয়েছে।

২. এখন প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতার ৫০ বছরে আমরা আজ কোথায়? কথা ছিল সবার জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত হবে। জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানবাধিকার কোন স্তরে? কেন শাল্লা, রামু, নাসিরনগরের মতো সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটেই চলেছে? কী বেদনায় ও হতাশায় সংখ্যালঘু মানুষ জন্মভূমি-দেশ ছেড়ে চলে যায়? কথা ছিল সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা সমাধানের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই নিয়ে কোনো কাজ শুরুই হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ছিল। ২৩ বছরেও সেটির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। দেশ দৃশ্যমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে সত্যি। অন্যদিকে আদিবাসী জনগণ তাদের চিরায়ত, ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে বিতাড়িত হচ্ছে। আদিবাসী অঞ্চলের নদীগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ নির্বিচারে উত্তোলন করে প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা হচ্ছে। দুর্বল ও ক্ষমতাহীন আদিবাসী মানুষ অসহায়। যে পাহাড় ও বনে আদিবাসীরা এক সময় স্বাধীন ও নিরাপদ বিচরণ করত, সেই বনে আদি অধিবাসীদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও আদিবাসীদের সঙ্গে কোনো সংলাপ ছাড়াই রিজার্ভ ফরেস্ট, ন্যাশনাল পার্ক, ইকো-পার্ক করা হচ্ছে এবং নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে প্রাকৃতিক বন উজাড় করে। মধুপুর বনে প্রায় ২৫ হাজার গারো ও কোচ আদিবাসীদের জীবন এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। বাসন্তী রেমার বাগান ধ্বংস করার মতো মানবাধিকার লংঘন সেখানে ঘটে চলেছে। চিম্বুক পাহাড়ে ফাইভ স্টার হোটেল নির্মাণ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ম্রো পাহাড়িরা প্রতিবাদ করছে। জাতিসংঘের ছয়টি সংস্থা সরকারকে এই হোটেল নির্মাণ বন্ধ করার জন্য চিঠি দিয়েছে। দীর্ঘ বছরেও আলফ্রেড সরেন, গিদিতা রেমা, চলেশ রিছিল হত্যার কোনো বিচার হয়নি। বাঘাইছড়ির কল্পনা চাকমার কোনো সন্ধান মেলেনি। এই হত্যাকা-গুলো ছিল জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচিত। প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল। সংবাদপত্রে অনেক রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল তখন। তারপরও এই সব মানবাধিকার লংঘনের সুষ্ঠু বিচার হয়নি।

৩. স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে কেন আমাদের প্রশ্ন করতে হয় দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা কত? কেন বিভাজিত তথ্য নেই রাষ্ট্রীয় তথ্যভা-ারে? আদিবাসী মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার, মানবাধিকারের আজ কী অবস্থা? এই নিয়ে কোনো কাজ আছে, রিপোর্ট আছে? সংখ্যালঘুদের জীবন ও নিরাপত্তা আজ কেমন? নাগরিক হিসেবে তাদের মানবাধিকার, মর্যাদা ও সম্মান কোন স্তরে? পাহাড়ের মানুষ, সুনামগঞ্জের শাল্লার ধর্মীয় সংখ্যালঘু, মধুপুর বনের রিজার্ভ ফরেস্টে বসবাসকারী গারো ও কোচ, চা জনগোষ্ঠী, দলিত মানুষ, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের দৃষ্টি দিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে দেখার চেষ্টা করলে সত্য জানা যাবে। আর আমরা ভাবব এই মানুষদের জন্য আরও অনেক কিছু করা জরুরি সামনের দিনগুলোতে। কেন আদিবাসী জনগণ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কোনো স্তরেই নেই? কেন আজও আদিবাসীদের মৌলিক মানবাধিকারকে রাষ্ট্রের চোখে দয়া ও করুণার দৃষ্টিতে দেখা হয়? সমাজকল্যাণমূলক যে সব পদক্ষেপ আদিবাসী মানুষের জন্য নেওয়া হয়, সেখানে কোথাও কি আছে আদিবাসীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার? যেহেতু ঐতিহাসিকভাবে আদিবাসীরা শোষণ, অবিচার ও বঞ্চনার শিকার, তাই ওরা অনগ্রসর রয়ে গেছে। এইসব কারণে আদিবাসীদের জন্য চাকরিতে কোটা ছিল, তাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আদিবাসীরা নিশ্চয় অনন্তকাল ধরে কোটা চায় না। আজ বলি, আদিবাসী মানুষের অধিকার হৃদয়ে ধারণ করা, সম্মান করা অথবা আদিবাসী অধিকার একটু বুঝতে চেষ্টা করার কাজটা আমরা যথাযথভাবে করতে পারিনি। জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগণ সম্পর্কে রাষ্ট্রের সঠিক নীতি প্রণীত হয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ বলেছিল, একটি সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা হবে। এই নিয়েও কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।

৪. আদিবাসীদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, আনন্দ-বেদনা-উন্নয়ন ও এগিয়ে যাওয়া জড়িয়ে আছে ওদের সামষ্টিক সংস্কৃতি চেতনায়। ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ বলে কোনো প্রবাদ আদিবাসী সংস্কৃতিতে নেই। মানুষ বাঁচে সবার সঙ্গে, সবার জন্য, সামষ্টিক ভাবনা নিয়ে। তাই তো ওরা পাহাড়-বন-নদী-ভূমির মালিকানা আর কেনাবেচা থেকে অনেক দূরে। ওদের এই মনস্তত্ত্বকে, জীবন ভাবনার বিশ্বজনীনতাকে আমাদের বুঝতে হবে। বুঝতে হবে ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে, গায়ের জোরে, শক্তির দাপটে নয়। ওদের জীবনে বহিরাগতরা প্রবল রাষ্ট্রীয় শক্তি নিয়ে ঢুকে গেছে আর সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের মতো চলে গেছে জমি, বন, পাহাড়, প্রাকৃতিক সম্পদ। ওরা এখন অধিকারহীন অসহায় মানুষ। সংবেদনশীল, বিনম্র, প্রচ- ভালোবাসা ছাড়া আদিবাসীদের উন্নয়ন এখন আর সম্ভব নয়। রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি সবখানে এই ভালোবাসার প্রতিফলন দরকার। আদিবাসীদের উন্নয়নের জন্য মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ওদের মনে যেন এই ধারণা না জন্মায়, ওরা অন্যের দ্বারা শাসিত হচ্ছে, শাসকগোষ্ঠী ওদের শাসন করছে। এই কাজটি করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং মূল দায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের। সবকিছুর জন্য দরকার আদিবাসীদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ আলাপ-আলোচনা ও সংলাপ। আদিবাসীদের আস্থায় এনে এ কাজটি করতে হবে। আদিবাসীদেরও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

আশা করি, একদিন রাষ্ট্র অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও মানবিক হবে। দেশে একটি সংবেদনশীল আদিবাসী নীতি থাকবে। সে নীতির মূল কথা হবে, আদিবাসী স্পর্শ বা ইনডিজিনাস টাচ। অসীম নম্রতা, শুদ্ধতা ও উদারতা নিয়ে লেখা হবে সেই নীতিমালার বাক্যগুলো। আমাদের সবাইকে মিলেমিশে রাষ্ট্রকে তার সঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। আদিবাসী-বাঙালি যোগাযোগের সংবাহন বিন্দু গড়ে উঠবে। সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই অথবা আকাশসীমার এক পৃথিবী রক্ত সবার লাল, কথাগুলো সত্যি হবে। এখানে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-সুরমার সঙ্গে সাংগু-মাইনী-বুগাই-সীমসাং নদীকে মেলাবার আয়োজন শুরু হবে, জীবনে জীবন যোগ হবেএই হোক স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমাদের আকাক্সক্ষা।

লেখক কলামনিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী
sanjeebdrong@gmail.com

সংবাদ সূত্র

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Facebook Page

Subscribe Please